সত্য ও জনস্বার্থের সংবাদ, প্রতিদিন
RAFA24 লোগো

বাংলা: মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইংরেজি: Tuesday, 08 September 2026

আরবি: الثلاثاء، ٨ سبتمبر ٢٠٢٦

Header Left Advertisement (320x100)
Advertisement Software Development Service
জাতীয়

জীবনস্বত্ব রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর: শরিয়াহ কী বলে? মুফতি ফয়জুল্লাহ

Abu Taher প্রকাশ: 08 Sep 2026, 06:49 AM 164 views 10 min read
জীবনস্বত্ব রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর:  শরিয়াহ কী বলে? মুফতি ফয়জুল্লাহ
“জীবনস্বত্ব রেখে সম্পত্তি হস্তান্তর:
শরিয়াহ কী বলে?”

"আমাদের এই কাজে যদি কোনো কল্যাণ থাকে, তবে তা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ; আর যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তবে তা আমাদের সীমাবদ্ধতা। আল্লাহ তাআলা আমাদের ক্ষমা করুন এবং সংশোধনের তাওফীক দিন।"

হেবা, মালিকানা, কবজ, পিতা-মাতার নিরাপত্তা, ওসিয়ত, উত্তরাধিকার এবং ফারায়েয।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026 পাস হয়েছে।

বিলটির মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি নতুন পদ্ধতি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এর মূল বৈশিষ্ট্য হলো—

কেউ সম্পত্তি অন্যের কাছে দান বা হস্তান্তর করবেন।

কিন্তু দাতা নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার সংরক্ষণ করবেন।

এটিকে বলা হয়েছে—ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে সম্পত্তি দান।

এখন প্রশ্ন—

এটি কি ইসলামের হেবা?

এটি কি শরিয়াহসম্মত?

এটি কি ফারায়েযের বিধানকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে?

নাকি এটি কেবল একটি দেওয়ানি আইনি ব্যবস্থা, যার উদ্দেশ্য বৃদ্ধ পিতা-মাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা?

আজ আমরা আবেগ দিয়ে নয়—

কুরআন, সুন্নাহ, হানাফি ফিকহ এবং আইনের প্রকৃত ভাষার আলোকে বিষয়টি বুঝার চেস্টা করবো ।

১. প্রথমেই: সংসদে কী পাস হয়েছে?

“সংসদে পাস হওয়া Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026”।

বলা হয়েছে —

চলমান কোনো আইন বা অন্য কোনো আইনে ভিন্ন কিছু থাকলেও, দাতা নিজের জন্য সম্পত্তিটি জীবনকাল পর্যন্ত ভোগের অধিকার—usufruct rights—সংরক্ষণ করে অস্থাবর বা স্থাবর সম্পত্তি দান করলে সেই হস্তান্তর বৈধ হবে।

Section 122A(2)

এটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়।

বিল অনুযায়ী—

পিতা বা মাতা → সন্তান বা সন্তানদের,

দাদা-দাদি/নানা-নানি → নাতি-নাতনিদের,

সন্তান বা নাতি-নাতনি → পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি/নানা-নানিকে,

এবং— স্বামী - স্ত্রী—

এই সম্পর্কগুলোর মধ্যে এমন হস্তান্তর করা যাবে।

স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে এই ঘোষণা করতে হবে।

Section 122A(3)

যদি গ্রহীতা দাতার জীবদ্দশায় মারা যান, তাহলে সম্পত্তি আইন অনুযায়ী গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাবে।

কিন্তু—

দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সম্পত্তির সঙ্গে বহাল থাকবে।

Section 122A(4)

এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিল বলছে— এটি এই আইনের অধীনে একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর-পদ্ধতি।

এরপর বলা হয়েছে— এই নতুন ব্যবস্থা প্রচলিত Gift, Heba বা অন্য কোনো স্বীকৃত transfer-এর বৈধতাকে সীমিত, খর্ব বা ক্ষতিগ্রস্ত করবে না।

এখানেই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত

আইনের নিজের ভাষাতেই এটি একটি “একটি স্বতন্ত্র হস্তান্তর-পদ্ধতি”

অতএব—

“এই নতুন পদ্ধতি = ইসলামী হেবা” এ কথা আইনগতভাবেও বলা যায় না।

এবার আসি ইসলামী হেবায়-

হানাফি ফিকহে হেবা মূলত মালিকানা হস্তান্তরের একটি চুক্তি।

ইমাম কাসানি রহ. বাদায়েউস সানায়ে-এ লিখেছেন:

فأما حكم الهبة فهو ثبوت الملك للموهوب له في الموهوب من غير عوض لأن الهبة تمليك العين من غير عوض

অর্থাৎ—

হেবার ফল হলো, বিনিময় ছাড়া হেবাকৃত বস্তুর মালিকানা গ্রহীতার জন্য সাব্যস্ত হওয়া।

কারণ—হেবা হলো বিনিময় ছাড়া কোনো বস্তুর মালিকানা প্রদান।

অর্থাৎ হেবার মূল বিষয়— মালিকানা।

শুধু ব্যবহার করার অনুমতি নয়।

৪. হেবায় কবজ কেন গুরুত্বপূর্ণ?

হানাফি ফিকহে হেবা শুধু ইজাব-কবুলের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয় না।

কবজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইবন আবিদিন রহ. রদ্দুল মুহতার-এ লিখেছেন:

(وتتم) الهبة (بالقبض) الكامل

অর্থাৎ—

“পূর্ণ কবজের মাধ্যমে হেবা সম্পূর্ণ হয়।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেছেন যে, কোনো সম্পত্তি যদি দাতার নিজের মালিকানাধীন জিনিস দিয়ে এমনভাবে আবদ্ধ থাকে যে গ্রহীতার পূর্ণ কবজ সম্ভব নয়, তাহলে হেবা পূর্ণ হওয়ার সমস্যা সৃষ্টি হয়।

আর ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া-তেও হেবার ক্ষেত্রে কবজকে শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে:

ومنها أن يكون الموهوب مقبوضا حتى لا يثبت الملك للموهوب له قبل القبض

অর্থাৎ—

হেবাকৃত বস্তু কবজে আসতে হবে; কবজের আগে গ্রহীতার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না।

৫. এখানেই নতুন আইনের সঙ্গে মূল ফিকহি প্রশ্ন

নতুন আইনে বলা হচ্ছে—

মালিকানা হস্তান্তর হবে, কিন্তু দাতা জীবনকাল পর্যন্ত usufruct বা ভোগাধিকার রাখবেন।

এখন শরিয়াহর প্রশ্ন হবে—

এই জীবনকালীন অধিকারটি ঠিক কী?

শুধু—বাসস্থানের অধিকার?

নাকি—ব্যবহারের অধিকার?

নাকি—ভাড়া, আয়, ফসল, দখল ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ?

এগুলো এক জিনিস নয়।

সুতরাং শুধু “দাতা ভোগ করবেন” শুনে হুকুম দেওয়া যথেষ্ট নয়।

দলিলের প্রকৃত ভাষা ও বাস্তব অধিকার দেখতে হবে।

৬. উমরা—عمرى—এর সঙ্গে কি এর সম্পর্ক আছে?

ফিকহে উমরা নামে একটি পরিচিত ব্যবস্থা আছে।

কেউ যদি বলেন—এই বাড়ি তোমাকে দিলাম, যতদিন তুমি বেঁচে থাকবে।”

হানাফি ফিকহে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

ইমাম কাসানি রহ. বাদায়েউস সানায়ে-এ বলেন, “عمرى” দ্বারা মালিকানা সময়সীমাবদ্ধ করার শর্ত গ্রহণযোগ্য নয়; হেবা যদি মূলত মালিকানা প্রদান হিসেবে সংঘটিত হয়, তাহলে সময়সীমার শর্ত বাতিল হয়ে হেবা বহাল থাকতে পারে।

তিনি বলেন:

لأن قوله داري لك تمليك العين للحال مطلقا ثم قوله عمرى توقيت التمليك... فبطل وبقي العقد صحيحا

অর্থাৎ—

“আমার বাড়ি তোমার”—এটি বর্তমানকালের মালিকানা প্রদান; পরে “উমরা” বলে সেটিকে সময়সীমাবদ্ধ করা মূল চুক্তির প্রকৃতির বিরোধী। ফলে সময়সীমার শর্ত বাতিল হবে এবং মূল হেবা বহাল থাকবে।

৭. রুকবা—رقبى—কি নতুন আইনের মতো?

না।

রুকবা সাধারণত এমন শর্তযুক্ত হেবা—

“আমি আগে মারা গেলে এটি তোমার, তুমি আগে মারা গেলে এটি আমার।”

অর্থাৎ মালিকানা ভবিষ্যৎ মৃত্যুর ঘটনার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

ইমাম কাসানি রহ. হানাফি মত ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন:

لأن قوله داري لك رقبى تعليق التمليك بالخطر

অর্থাৎ রুকবার মধ্যে মালিকানা অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ঘটনার সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।

হানাফি ফিকহে আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদের মতে এ ধরনের “রুকবা” হেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় না; বরং অন্য হুকুমের দিকে যায়। আবু ইউসুফের আলাদা মতও তিনি উল্লেখ করেছেন।

তাই—

নতুন Section 122A = রুকবা

এ কথা বলা ভুল।

কারণ এখানে দাতা মারা গেলে সম্পত্তি দাতার কাছে ফিরে যাওয়ার শর্ত নেই।

বরং দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় গ্রহীতা মারা গেলে সম্পত্তি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে, আর দাতার usufruct বহাল থাকবে।

৮. হেবা আর ওসিয়ত এক জিনিস নয়

এখানে আরেকটি বড় ভুল ধারণা দূর করা দরকার।

কেউ যদি বলেন—

“আমি এখন সম্পত্তির মালিকানা দিলাম না; আমার মৃত্যুর পর তুমি পাবে।”

এটি হেবা নয়।

এটি ওসিয়ত।

হেবা—

জীবদ্দশায় মালিকানা হস্তান্তর।

ওসিয়ত—

মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার নির্দেশ।

৯. এক-তৃতীয়াংশের বিধান কোথায়?

এখানে একটি বিশেষ সংশোধন প্রয়োজন।

অনেকে বলেন—

“ইসলামে হেবা এক-তৃতীয়াংশের বেশি দেওয়া যায় না।”

এটি সঠিক নয়।

এক-তৃতীয়াংশের সীমা মূলত ওসিয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত।

রাসুলুল্লাহ ﷺ সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস রা.-কে বলেছিলেন:

الثُّلُثُ، وَالثُّلُثُ كَثِيرٌ

“এক-তৃতীয়াংশ; আর এক-তৃতীয়াংশও অনেক।”

সুতরাং—

হেবা - ওসিয়ত।

জীবদ্দশায় প্রকৃত হেবা হলে এক-তৃতীয়াংশের সীমাকে হেবার সাধারণ বিধান বলা যাবে না।

১০. তবে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত করার উদ্দেশ্য?

এখানে শরিয়াহর সতর্কতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইবন আবিদিন রহ. রদ্দুল মুহতার-এ আল-খানিয়া-র বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন:

وكذا في العطايا إن لم يقصد به الإضرار، وإن قصده فسوى بينهم... ولو وهب في صحته كل المال للولد جاز وأثم

অর্থাৎ—

সন্তানদের দানের ক্ষেত্রে যদি ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্য না থাকে, তাহলে এক ধরনের ছাড় আছে; কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় ক্ষতি করা, তাহলে বিষয়টি নিন্দনীয়। এমনকি সুস্থ অবস্থায় নিজের পুরো সম্পত্তি কোনো সন্তানকে হেবা করলে তা কার্যকর হতে পারে, কিন্তু অন্যায় উদ্দেশ্যের কারণে দাতা গুনাহগার হতে পারেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি পার্থক্য আছে—

হেবা সহিহ হওয়া এবং দাতার গুনাহগার হওয়া—দুটি আলাদা প্রশ্ন।

১১. ফারায়েযের বিধান আল্লাহর নির্ধারিত বিধান

আল্লাহ তাআলা বলেন:

يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ

“আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন...”

এরপর উত্তরাধিকারীদের নির্ধারিত অংশ বর্ণনা করে আল্লাহ বলেন:

فَرِيضَةً مِنَ اللَّهِ

“এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান।”

সূরা আন-নিসা: ১১।

আর পরের আয়াতে উত্তরাধিকার ও ওসিয়তের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

غَيْرَ مُضَارٍّ وَصِيَّةً مِنَ اللَّهِ

অর্থাৎ এমনভাবে নয় যাতে কারও ক্ষতি করা হয়; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে বিধান।

অতএব—

ফারায়েয কোনো পারিবারিক পছন্দের বিষয় নয়।

এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান।

১২. কিন্তু জীবিত অবস্থায় উত্তরাধিকার কার্যকর হয় না

এখানেও ভারসাম্য জরুরি।

কোনো ব্যক্তি জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর সম্পত্তির ওপর তাঁর সন্তানদের মিরাসের অধিকার কার্যকর হয়ে যায় না।

মিরাস কার্যকর হয়—

মালিকের মৃত্যুর পর।

সুতরাং একজন সুস্থ ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি বৈধভাবে হেবা করলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে “মিরাসের অংশ কেটে দেওয়া” বলা যাবে না।

কিন্তু—

যদি হেবাটি কেবল নামমাত্র হয়,

যদি প্রকৃত মালিকানা না যায়,

যদি কবজ সম্পন্ন না হয়,

অথবা মৃত্যুর পর কার্যকর করার উদ্দেশ্যে করা হয়—

তখন হুকুম ভিন্ন হবে।

১৩. মৃত্যুর পর কার্যকর হলে?

যদি কেউ বলেন—

“আমার মৃত্যুর পর এই বাড়ি আমার ছেলের হবে।”

তাহলে এটি হেবা নয়।

এটি ওসিয়ত।

এক্ষেত্রে এক-তৃতীয়াংশের বিধান সামনে আসবে।

আর কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়তের ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى كُلَّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ

“নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার অধিকার দিয়েছেন; সুতরাং কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই।”

১৪. তাহলে নতুন আইনের শরয়ি মূল্যায়ন কী?

এখন আমরা সিদ্ধান্তের কাছাকাছি এসেছি।

নতুন Section 122A বলছে—

সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে চলে যাবে। কিন্তু দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ব্যবহার, বসবাস বা ভোগ করার অধিকার রাখবেন।

আইনের দৃষ্টিতে এটি সাধারণ হেবা নয়; বরং সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি আলাদা আইনগত পদ্ধতি।”

সুতরাং—

আইনগতভাবে এটি হেবা নয়।

কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য শরিয়াহর প্রশ্ন এখানেই শেষ নয়।

কারণ আমাদের দেখতে হবে—

এক.

প্রকৃত মালিকানা কি সত্যিই গ্রহীতার কাছে চলে গেছে?

দুই.

দাতার সংরক্ষিত অধিকারটি কী?

তিন.

গ্রহীতা কি সম্পত্তির ওপর প্রকৃত মালিকানাগত ক্ষমতা পেয়েছেন?

চার.

দাতার অধিকার কি শুধু সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন ?

নাকি বাস্তবে তিনি মালিকের মতো সব ক্ষমতা ধরে রেখেছেন?

পাঁচ.

হস্তান্তরের উদ্দেশ্য কী?

পিতা-মাতার নিরাপত্তা?

নাকি কোনো উত্তরাধিকারীকে ভবিষ্যৎ মিরাস থেকে বঞ্চিত করা?

একটি বাস্তব উদাহরণ

ধরুন—

একজন পিতা তাঁর বাড়ি তাঁর ছেলের কাছে Section 122A-এর অধীনে হস্তান্তর করলেন।

দলিলে পিতার জীবনকাল পর্যন্ত বাড়িতে বসবাস ও ভোগের অধিকার রইল।

এখন যদি সত্যিই—

মালিকানা ছেলের কাছে চলে যায়

এবং—

পিতার অধিকার কেবল জীবনকালীন সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারা হয়,

তাহলে বিষয়টি সরাসরি “ওসিয়ত” নয়।

এটি সরাসরি “রুকবা”ও নয়।

এবং এটিকে প্রচলিত হেবা বলাও সঠিক নয়।

বরং এটি—

একটি স্বতন্ত্র আইনগত transfer arrangement।

কিন্তু যদি বাস্তবে দেখা যায়—

পিতা কোনো মালিকানা ছাড়েননি,

ছেলেকে প্রকৃত কর্তৃত্ব দেননি,

সব সিদ্ধান্ত নিজেই নিচ্ছেন,

এবং কেবল মৃত্যুর পর ছেলের মালিক হওয়ার ব্যবস্থা করেছেন—

তাহলে সেটি ফিকহি দৃষ্টিতে ভিন্নভাবে বিচার করতে হবে।

১৬. পিতা-মাতার নিরাপত্তা কি শরিয়াহর বিরুদ্ধে?

কখনোই নয়।

ইসলাম পিতা-মাতার অধিকারকে অত্যন্ত মর্যাদা দিয়েছে।

আল্লাহ বলেছেন:

وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا

“পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচরণ করো।”

তাই এমন আইন, যার উদ্দেশ্য—

বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে সন্তানদের হাতে সম্পত্তি দেওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়া থেকে রক্ষা করা—

তার উদ্দেশ্য নিজে শরিয়াহবিরোধী নয়।

কিন্তু—

ভালো উদ্দেশ্য থাকলেই প্রতিটি পদ্ধতি শরিয়াহসম্মত হয়ে যায় না।

পদ্ধতিটিও শরিয়াহর নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।

১৭. আমার ভারসাম্যপূর্ণ ফিকহি সিদ্ধান্ত

সবগুলো দলিল একত্র করলে আমার প্রাথমিক ভাবনা হলো—

১.Transfer of Property (Amendment) Bill, 2026-এর Section 122A ইসলামী হেবা নয়; এটি আইনগতভাবে একটি স্বতন্ত্র transfer mechanism। [১]

২.হানাফি হেবা হলো বিনিময় ছাড়া মালিকানা হস্তান্তর; আর হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য পূর্ণ কবজ গুরুত্বপূর্ণ। [২][৩]

৩.জীবনকালীন usufruct সংরক্ষণ করা হয়েছে বলেই ব্যবস্থাটিকে এককথায় “হারাম” বলা যথেষ্ট ফিকহি বিশ্লেষণ হবে না ?

৪.আবার—এটিকে নিঃশর্তভাবে “শরিয়াহসম্মত হেবা” বলাও ঠিক হবে না।

৫.যদি প্রকৃত মালিকানা হস্তান্তর হয় এবং দাতার অধিকার কেবল নির্দিষ্ট জীবনকালীন usufruct হয়, তাহলে এটি স্বতন্ত্র আইনি কাঠামো হিসেবে বিচার করতে হবে।

৬. যদি এর উদ্দেশ্য হয়—

“আমার অমুক সন্তান যেন আল্লাহর নির্ধারিত মিরাস না পায়”

তাহলে এই উদ্দেশ্য শরিয়াহসম্মত নয়।

৭.হেবা সহিহ হওয়া এবং দাতা গুনাহগার হওয়া—দুটি পৃথক বিষয়। হানাফি ফিকহে সুস্থ অবস্থায় সম্পূর্ণ সম্পত্তি কোনো সন্তানকে হেবা করার বৈধতার কথা উল্লেখ থাকলেও ক্ষতিসাধনের উদ্দেশ্য নিন্দনীয়। [৪]

৮.মৃত্যুর পর কার্যকর করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি দেওয়া হলে সেটি হেবা নয়; ওসিয়তের বিধানের অধীন হবে। [৫]

১৮. তাই মুসলিমদের জন্য আমার পরামর্শ

কেউ এই নতুন আইনের অধীনে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে চাইলে—

শুধু আইনজীবীর পরামর্শ নিয়ে দলিল করবেন না।

আবার শুধু সাধারণ ধর্মীয় বক্তব্য শুনেও সিদ্ধান্ত নেবেন না।

দলিলের খসড়া একজন দক্ষ সম্পত্তি আইনজীবীকে দেখান।

একই সঙ্গে—একজন অভিজ্ঞ হানাফি মুফতি বা ফকিহকে দলিলের প্রকৃত ভাষা দেখান।

বিশেষ করে জিজ্ঞেস করুন—

১. মালিকানা কখন হস্তান্তর হচ্ছে?

২. কবজ কীভাবে হবে?

৩. দাতার usufruct-এর সীমা কী?

৪. দাতা ভাড়া বা আয় নিতে পারবেন কি না?

৫. সম্পত্তি বিক্রি বা বন্ধক দেওয়ার ক্ষমতা কার?

৬. গ্রহীতা মারা গেলে কী হবে?

৭. দাতার উদ্দেশ্য কী?

৮. ভবিষ্যৎ মিরাসের ওপর এর কী প্রভাব পড়বে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া কোনো নির্দিষ্ট দলিলকে শরিয়াহসম্মত বা শরিয়াহবিরোধী বলা নিরাপদ নয়।

শেষ কথাঃ

ইসলাম পিতা-মাতার নিরাপত্তা চায়।

ইসলাম সন্তানের অধিকারও স্বীকার করে।

ইসলাম সম্পত্তির মালিকের বৈধ অধিকারও স্বীকার করে।

এবং ইসলাম আল্লাহর নির্ধারিত ফারায়েযকে অক্ষুণ্ণ রাখে।

তাই আমাদের নীতি হওয়া উচিত—

পিতা-মাতাকে নিরাপদ রাখব।

কিন্তু ফারায়েযকে পাশ কাটাব না।

সম্পত্তির বৈধ অধিকার ব্যবহার করব।

কিন্তু আল্লাহর বিধানকে কৌশলে এড়িয়ে যাব না।

রাষ্ট্রীয় আইন তার নিজস্ব ক্ষেত্রে কাজ করবে।

আর একজন মুমিনের কাছে—

আল্লাহর শরিয়াহ সর্বোচ্চ মানদণ্ড।

তাই নতুন এই আইনের উদ্দেশ্য যদি হয়—

বৃদ্ধ পিতা-মাতার নিরাপত্তা,

তাহলে সেই উদ্দেশ্যকে আমরা অন্যভাবেও কার্যকর করার কথা ভাবতে পারি।

কিন্তু প্রয়োগ এমন হতে হবে—

যাতে হেবা, ওসিয়ত ও ফারায়েযের মৌলিক শরয়ি বিধান পরস্পরের সঙ্গে গুলিয়ে না যায়।

আইনের সুযোগ নেব—কিন্তু শরিয়াহর সীমা অতিক্রম করব না।

পিতা-মাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করব—কিন্তু আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার নষ্ট করব না।

এটাই ইনসাফ।

এটাই ভারসাম্য।

এটাই ইসলামের সৌন্দর্য।

والله أعلم بالصواب আবারও বলছি - "আমাদের এই কাজে যদি কোনো কল্যাণ থাকে, তবে তা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহ; আর যদি কোনো ত্রুটি থাকে, তবে তা আমাদের সীমাবদ্ধতা। আল্লাহ তাআলা আমাদের ক্ষমা করুন এবং সংশোধনের তাওফীক দিন।"

মন্তব্য (0)

আপনার মন্তব্য লিখুন

Footer Advertisement (970x90)